৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :

চৌদ্দগ্রামে মিডিয়া কর্মীর পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এক রিপোর্টারের বিরুদ্ধে ‘গুনবতী টিভি’ নামে একটি অনলাইন পেজের মাধ্যমে গরীব, অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সহযোগীতা চেয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী। সহযোগীতা চাওয়া অধিকাংশ ভিডিওতে নিজের ব্যবহৃত বিকাশ নাম্বার ব্যবহার করেছেন গুনবতী টিভি ও এমকে টেলিভিশনের অফিস প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়া এ রিপোর্টার। সে ইউনিয়নের চাপাচৌ গ্রামের নুর হোসেনের ছেলে। সর্বশেষ উপজেলার গুনবতী ইউনিয়নের কর্তাম গ্রামের জাহানারা বেগম নামীয় এক মহিলার ঘর নির্মাণে একটি ভিডিও প্রকাশ করে নিজের ব্যক্তিগত বিকাশ নাম্বার ব্যবহার করে ফেঁসে গেছেন এ রিপোর্টার। গুনবতী টিভিতে প্রকাশিত ভিডিওতে রিপোর্টার জানান, একটি ঝুপড়ি ঘরে (যা দেখতে হাস-মুরগীর খোয়াড়ের মতো) কোনভাবে মহিলাটি বসবাস করে। টাকার অভাবে সে ঘর নির্মাণ করতে পারছেনা। এসময় তার ঘর নির্মাণে আর্থিক সহায়তা চেয়ে সে পরদিন গুনবতী টিভি নামক ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এ ভিডিওর প্রতিবাদে গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে আরেকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে। গ্রামবাসীর ভিডিওতে দেখা যায়, ইতোপূর্বে দেখানো ঘরটি মুলত হাস-মুরগী রাখার ঘর। পাশেই রয়েছে মহিলার থাকার বিল্ডিং ঘর। মহিলার পরিবারও ঘটনাটি মিথ্যা বলে স্বীকার করে।

স্থানীয়ভাবে জানা যায়, মেহেদী হাসান সর্বোচ্চ ৮ম শ্রেণী পাস করে। কখনো রিপোর্টার, কখনো মানবাধিকার কর্মী, কখনো রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েই মুলত সে চলে। বিগত বহু বছর পুর্বে সে মালয়েশিয়ায় চলে যায়। মালয়েশিয়ায় বসেই এসব নিজের পেজসহ ২-৩টি পেজ খুলে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে সে। লকডাউনের শুরুতেই দেশে এসে মানুষের বিপদ, আপদ, সমস্যা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করে অবস্থান জানান দেন। প্রতিবন্ধী, অসহায়, ঘর নির্মাণ, হুইল চেয়ার প্রদান, মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণে সহযোগীতা চেয়ে একে একে আলকরা ও গুনবতী ইউনিয়ন নিয়ে অন্তত ১০-১২টি ভিডিও প্রকাশ করে। অধিকাংশ ভিডিওতে নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে। গুনবতী টিভির ফেসবুক আইডি ঘুরে এসব পোষ্টের সত্যতা পাওয়া যায় এবং অধিকাংশ পোষ্টে জাফর হাজারীর ব্যবহৃত ০১৮৮৫৫০১২০ নাম্বারটি বিকাশ নাম্বার হিসেবে পাওয়া যায়।

জাহানারার নিকটাতœীয় কর্তাম গ্রামের মোশারফ হোসেন সোহেল জানান, বিগত কয়েকদিন পূর্বে কর্তাম গ্রামে মেহেদী হাসান জাফর হাজারী নামক রিপোর্টার আমার আতœীয়কে নিয়ে নিজের বিকাশ নাম্বার ব্যবহার করে একটি মিথ্যা রিপোর্ট করেছে। মুলত: জাহানারা বেগম একজন সহজ-সরল মহিলা। বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ায় সে তার ভাইয়ের সাথে থাকে। তাদের থাকার ঘর রয়েছে। এছাড়াও গুনবতী বাজার সংলগ্ন বাড়ি হওয়ায় সে অন্তত ৪০-৫০ লক্ষ টাকার সম্পত্তির মালিক। এ রিপোর্টকে কেন্দ্র করে বানানো ভিডিওটি পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় সে আইডি থেকে কেটে দেয়।
স্থানীয় ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার শাহজাহান সাজু বলেন, গ্রামবাসী এবং এক রিপোর্টারের পাল্টাপাল্টি ভিডিও ধারনের কথা শুনেছি। মহিলার ঘরের বিষয়টি সরেজমিনে গিয়ে জানাতে হবে।

রাজবল্লভপুরে গ্রামের মামুন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তার ছেলে জাকির হোসেন নাইম (১২) জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। বিগত ৬-৭ মাস পূর্বে জাফর হাজারী খবর পেয়ে আতœীয় পরিচয় দিয়ে আমার বাড়িতে আসেন। এসময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। সে আমার স্ত্রীকে একটি হুইল চেয়ার প্রদান করবে মর্মে রাজি করিয়ে আমার ছেলের ছবি ও ভিডিও নেয়। পরবর্তীতে আমার বেশ কয়েকজন আতœীয় জানায়, গত ৫ই অক্টোবর ফেসবুকে আমার ছেলের ছবি দিয়ে গুনবতী টিভি নামক পেজ থেকে রিপোর্টার জাফর হাজারীর বিকাশ নাম্বারে সহযোগীতা চাওয়া হয়েছে। আমি এতে বিব্রতবোধ করি। কিন্তু পরবর্তীতে বিগত ৬-৭ মাসেও আমি কোন সহযোগীতা পাইনি।

গুনবতী বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, কিছুদিন পূর্বে গুনবতী বাজারের এক ঝাড়–দারের জন্য সহযোগীতা চেয়ে একটি পোষ্ট করে। পরবর্তীতে বাজার কমিটি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে পোষ্টটি কেটে দেয়।
আলকরা ইউনিয়নের লাটিমী গ্রামের জানু মিয়া নামের এক প্রতিবন্ধী যুবকের চিকিৎসায় সহযোগীতা চেয়ে গত ১৮ই ডিসেম্বর থেকে গুনবতী টিভিতে নিজ বিকাশ নাম্বার ব্যবহার করে প্রচার প্রচারনা চালানো হয়। সম্প্রতি প্রতিবেদক প্রতিবন্ধী জানু মিয়ার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলে জানু মিয়ার বোন খাদিজা জানান, মেহেদী হাসান নামে গুনবতী টিভির পরিচয়ে কিছুদিন আগে তার ভাইয়ের ছবি তুলে নিয়ে যায়। ঐসময় আমাদের বিকাশ নাম্বার থাকলেও সে আমাদের নাম্বার না নিয়ে নিজের নাম্বার ব্যবহার করে গুনবতী টিভিতে আমার ভাইয়ের ছবি দিয়ে টাকা কালেকশান করে। আমরা পরবর্তীতে তার সাথে যোগাযোগ করলে সে পরে ফোন দিবে বলে ফোন কেটে দেয়। এরপর আর আমাদের ফোন ধরেনি।

এদিকে গুনবতী টিভির ফেসবুক পেজ ঘুরে দেখা যায়, গত ১৫ই অক্টোবর রিপোর্টারের নিজের ছবি এবং ব্যক্তিগত বিকাশ নাম্বার ব্যবহার করে একজন বিদেশ ফেরৎ অসহায় ব্যক্তির সহযোগীতায় টাকা চাওয়া হয়, ৬ই ডিসেম্বর আরেকটি পোষ্টে একই নাম্বার ব্যবহার করে ইউনিয়নের বুধরা গ্রামের ক্যান্সারে আক্রান্ত এক মহিলার চিকিৎসায় সহায়তা চাওয়া হয়, ১৮ই ডিসেম্বর আলকরা ইউনিয়নের লাটিমী গ্রামের জানু মিয়ার চিকিৎসায় সহযোগীতা চেয়ে একই নাম্বার ব্যবহার করে আরেকটি পোষ্ট করা হয়, ২৭শে ডিসেম্বর একই ইউনিয়নের কুলাসার গ্রামের দুলা মিয়া পাটোয়ারী বাড়ীর আলেয়া ও রোকেয়ার ঘর নির্মাণে সহযোগীতা চেয়ে একই নাম্বার ব্যবহার করে আরেকটি পোষ্ট করা হয়।

স্থানীয়রা আরও জানায়, গুনবতী ইউনিয়নের চাপাচৌ গ্রামের মেহেদী হাসান ওরফে জাফর হাজারী। গুনবতী টিভি নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে ভিডিওর মাধ্যমে কখনো গরীব বিধবার ঘর নির্মাণ, কখনো প্রতিবন্ধী শিশুর হুইল চেয়ার ক্রয়ে, কখনো মসজিদ মাদ্রাসায় সহযোগীতা চেয়ে, কখনো বাজারের ঝাড়–দারের জন্য টাকা চেয়ে ইতোমধ্যেই ভাইরাল হয়েছেন দক্ষিণ চৌদ্দগ্রামে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহযোগীতা চেয়েছেন নিজের ব্যক্তিগত বিকাশ মোবাইল নাম্বার দিয়ে। এক্ষেত্রে সে কাজে লাগিয়েছেন সাংবাদিক পরিচয়। গ্রামগঞ্জে পরিচয় দিয়েছেন ৩-৪টি অনলাইন টিভি চ্যানেল এবং প্রিন্ট মিডিয়ার।

এ বিষয়ে জাফর হাজারী বলেন, আমার গুনবতী টিভির জনপ্রিয়তা অনেকের সহ্য হয়নি। একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কর্তাম গ্রামের সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার সহযোগীতা চাওয়া ভিডিওতে দেখানো মুরগীর ঘরকে থাকার ঘর বানিয়ে প্রচারের বিষয়ে তিনি বলেন, মহিলাটি কান্নাকাটি করে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়, সে হয়তো কোন ষড়যন্ত্র করে ঐ ঘরকে বসতঘর বলে আমাকে বিভ্রান্ত করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন সহযোগীতা চাওয়া ভিডিওতে নিজ নাম্বার ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, অধিকাংশ সাহায্য চাওয়া ব্যক্তির বিকাশ নাম্বার থাকেনা তাই আমার নাম্বার ব্যবহার করি।

সবুজ বাংলা নিউজ পরিবার

জিয়াউর রহমান হায়দার

প্রকাশক ও সম্পাদক
মোবাইল: ০১৮১৭ ৪৫০০৯৬

মোঃ নাজমুল হক

নির্বাহী সম্পাদক
মোবাইল: ০১৭১০ ৯১৩৩৬৬

রানা মিয়া

সহযোগী সম্পাদক
মোবাইল: ০১৮৮১ ১৪১৮৬৬